ভূমিকম্প: কারণ, লক্ষণ, প্রস্তুতি ও বেঁচে থাকার বৈজ্ঞানিক কৌশল
ভূমিকম্প এমন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ যা কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই ঘটে যেতে পারে। পৃথিবীর ভূ-ত্বকের আকস্মিক নড়াচড়ার ফলে এই কম্পন সৃষ্টি হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে ভূমিকম্প বহুবার ভয়াবহ ক্ষতির সৃষ্টি করেছে। তবে সচেতনতা, সঠিক প্রস্তুতি এবং বৈজ্ঞানিক তথ্য জানা থাকলে ভূমিকম্পে ক্ষতির ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
ভূমিকম্প কীভাবে হয়?
পৃথিবীর বাইরের স্তর বা লিথোস্ফিয়ার কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন টেকটনিক প্লেট দিয়ে তৈরি। এই প্লেটগুলো প্রতিনিয়ত ধীরে ধীরে সরে যায়। দুই বা ততোধিক প্লেট যখন সংঘর্ষে লিপ্ত হয় বা একে অপরের নিচে সরে যায়, তখন জমে থাকা চাপ মুক্ত হয়ে কম্পন তৈরি করে — একে বলা হয় ভূমিকম্প।
টেকটনিক প্লেট নড়াচড়ার প্রধান ধরন:
- Convergent Boundary: প্লেটগুলো মুখোমুখি ধাক্কা খায়।
- Divergent Boundary: প্লেট পরস্পর থেকে দূরে সরে যায়।
- Transform Boundary: দুটি প্লেট পাশ কাটিয়ে ঘর্ষণ সৃষ্টি করে।
এই ঘর্ষণ বা চাপের মুক্তি যখন ভূ-গর্ভে ঘটে, তখন তার কেন্দ্র বলা হয় Focus এবং এর ঠিক উপরের ভূ-পৃষ্ঠীয় বিন্দুকে বলা হয় Epicenter। এখান থেকেই ভূকম্পন সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়।
ভূমিকম্পের মাত্রা ও তীব্রতা
ভূমিকম্পের শক্তি বা মাত্রা মাপা হয় রিখটার স্কেল এবং তীব্রতা মাপা হয় Modified Mercalli Scale দিয়ে।
- ২ এর নিচে: প্রায় অনুভূত হয় না।
- ৩–৪: হালকা কম্পন, দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হয় না।
- ৫–৬: সামান্য ক্ষতি হতে পারে।
- ৭–৮: বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি, ভবন ধ্বসে পড়ার ঝুঁকি।
- ৮–৯+: ভয়াবহ ধ্বংস।
ভূমিকম্পের আগে কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে?
যদিও ভূমিকম্প সঠিকভাবে পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়, তবুও কিছু লক্ষণ মাঝে মাঝে পূর্বাভাস হিসেবে দেখা যায়—
- জায়গা বিশেষে অস্বাভাবিক শব্দ বা গর্জন
- পাখি বা প্রাণীর আচরণ হঠাৎ পরিবর্তন
- পানির স্তরে অস্থিরতা
- ভূমির সামান্য দুলুনি অনুভব
তবে এসব সবসময় ভূমিকম্পের নিশ্চয়তা দেয় না — তাই প্রস্তুতি থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে ভূমিকম্প ঝুঁকি কেন বেশি?
বাংলাদেশ তিনটি টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত—
- ইন্ডিয়ান প্লেট
- ইউরেশিয়ান প্লেট
- বার্মা প্লেট
এ কারণে এখানে ভূমিকম্পের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট অঞ্চলকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ভূমিকম্পের সময় কী করবেন?
যদি ভূমিকম্প শুরু হয়, মনে রাখুন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত তিনটি কৌশল:
১) DROP (নমে পড়ুন)
সোজা দাঁড়িয়ে থাকলে পড়ে গিয়ে আঘাত লাগার সম্ভাবনা বেশি। তাই দ্রুত মাটিতে বসে পড়ুন।
২) COVER (মাথা ঢেকে রাখুন)
কোনো টেবিল, ডেস্ক বা শক্ত কিছু থাকলে তার নিচে আশ্রয় নিন। হাত দিয়ে মাথা ও ঘাড় ঢেকে রাখুন।
৩) HOLD (ধরে রাখুন)
টেবিল বা আশ্রয় শক্তভাবে ধরে রাখুন যাতে নড়াচড়া হলেও সুরক্ষিত থাকতে পারেন।
যদি ভবনের ভেতরে থাকেন
- দৌড় দেবেন না, বাইরে যাওয়ার চেষ্টা বিপজ্জনক।
- লিফট ব্যবহার করবেন না।
- জানালা, কাঁচ, ফ্যান, বুকশেলফ থেকে দূরে থাকুন।
- টয়লেট বা রান্নাঘর এড়িয়ে চলুন — সেখানে সবচেয়ে বেশি পাইপলাইন থাকে।
যদি বাইরে থাকেন
- খোলা জায়গায় দাঁড়ান।
- ভবন, বৈদ্যুতিক খুঁটি, গাছ, ফ্লাইওভার থেকে দূরে থাকুন।
- যদি গাড়িতে থাকেন, সাইডে গিয়ে গাড়ি থামিয়ে দিন।
ভূমিকম্পের পরে করণীয়
- চারপাশে সতর্কভাবে দেখুন — কোথাও গ্যাস লিক, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট বা রাস্তা ভেঙে গেছে কি না।
- নিজে নিরাপদে থাকলে অন্যকে সাহায্য করুন।
- অনাবশ্যক ফোন ব্যবহার করবেন না যাতে লাইন ব্যস্ত না হয়।
- সরকারি নির্দেশ অনুসরণ করুন।
ভূমিকম্পের জন্য প্রয়োজনীয় জরুরি কিট
একটি ছোট ‘Emergency Disaster Kit’ ঘরে রেখে দেয়া খুবই জরুরি। এতে থাকা উচিত—
- টর্চ
- বাতারি
- প্রাথমিক চিকিৎসা কিট
- খাবার ও পানির বোতল
- সিটি বা হুইসেল
- গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রের কপি
- পাওয়ার ব্যাংক
ভূমিকম্পে নিরাপদ থাকার বৈজ্ঞানিক কৌশল
- বিল্ডিং কোড মেনে নির্মাণ করা ভবন ভূমিকম্পে বেশি নিরাপদ।
- ফার্নিচার দেয়ালে স্ক্রু দিয়ে আটকিয়ে রাখলে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে।
- ভারী জিনিস ঘরের নিচের দিকে রাখলে ঝুঁকি কমে।
- পরিবারের সকল সদস্যকে ভূমিকম্প ড্রিল শেখানো জরুরি।
শেষ কথা
ভূমিকম্প কখনোই থামানো সম্ভব নয়, কিন্তু সচেতনতা ও প্রস্তুতি আমাদের জীবন বাঁচাতে পারে। নিজের পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং আশেপাশের মানুষদের ভূমিকম্প সম্পর্কে সচেতন করা আমাদের দায়িত্ব। আজ থেকেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করুন এবং জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকুন।
নিরাপদ থাকুন, সচেতন থাকুন।






